বুলেট প্রুফ গ্লাসের আদ্যোপান্ত

​পাজেরো গাড়িতে করে যাচ্ছেন দেশের উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকর্তা। শাহবাগ ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের ছাদে হাইলি ট্রেইন্ড একজন স্নাইপার টানা ছয় ঘন্টা ​ ​একটা নিশ্চিত শটের জন্যে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। 

​শাহবাগ বেঁছে নেওয়ার কারন একটা অব্যর্থ শট নেওয়ার জন্যে প্রথমেই লাগবে বুলেটের জন্যে পরিষ্কার গতিপথ। এর পরে আসে বাতাসের গতিবেগ​ কারন বাতাস বুলেটের গতিপথকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। আলো ব্যাপারটাও একটা বড় বিষয়। শাহবাগের প্রচুর শব্দ .৫০ক্যালিবারের একটা রাইফেলের শব্দ অনেকাংশেই ঢেকে ফেলবে। সবচেয়ে বড় কথা শট নেওয়ার পরে শ্যুটারের পজিশন থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবার সহজ ব্যবস্থা শাহবাগ ।  

সামনে ​বিশ্ব বিদ্যালয়ের ​রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। কারন এমন একটা টার্গেট যা একবার মিস হলে দ্বিতীয়বার সুযোগ পাওয়া যাবে না।  একটা পুলিশ কনভয়্যার আসবে। কথিত নিছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ের মধ্য দিয়ে  আসা একজন হোমরা চোমড়া লোকের অপেক্ষায় শ্যুটার।  বাতাসের গতিবেগে ​বুলেটের গতিপথ খুব একটা পরিবর্তন হবে না। বুলেটের ড্রপ কতটুকু হবে সেই দুই ঘন্টা আগেই হিসেব করে রাখা আছে। দুইশ গজের মধ্যে শট নেওয়ার ইচ্ছে, যাতে করে কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া যায়।  

​তিনটা’র দিকে পুলিশ কনভয়ের দেখা মিলল। ধীর গতিতে শাহবাগ মোড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। হটাতই টার্গেটকে ২৫০ মিটার সামনে দেখা গেল। M 82 রাইফেলের স্কোপের মধ্য দিয়ে স্লোমোশনে একাগ্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বর্তমান দুনিয়া চারপাশের পরিবেশ সব হারিয়ে গেল। অস্তিত্বে এখন শুধুমাত্র সম্ভাব্য টার্গেট।

নির্দিষ্ট দূরত্বে ​টার্গেট আসতেই কখন ট্রিগারের গায়ে চাপ পড়েছে বলতে পারবে না। বুলেটের শব্দে সংবতি ফিরে আসল। পাজেরোর গ্লাস ছিদ্র হয়ে টার্গেটের কপালে একটা লাল ছিদ্রের সৃষ্টি হয়েছে । কনভয়ের লোকজন কিছু বুঝার আগেই তেরপাল থেকে উঠে নীচে নেমে জনসমুদ্রে স্নাইপার হাওয়া হয়ে গেল। 

​পরের দিন থেকে প্রায় সব পদস্থ কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়ে নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে চিঠি দিয়েছেন। জরুরি মিটিং এ বুলেট প্রুফ গাড়ির সিদ্ধান্ত আসে। ​বুলেট প্রুফ গাড়ির একটা গুরুত্বপূর্ন অংশ হল বুলেট প্রুফ গ্লাস।

বুলেট প্রুফ গ্লাস

একটা রাইফেল বা পিস্তলের গতিবেগ থাকে প্রচন্ড রকমের ফাস্ট। চোখের পলকে কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলে। সামনে যা পায় গতিসীমার মধ্যে চেষ্টা করে ছিদ্র করে বের হয়ে যেতে। ওয়াল সহ হালকা পাতলা সীট পর্যন্ত বেধ করে যেতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের রক্ষার জন্যে তাদের সামনে এমন কিছু রাখতে হবে যাতে বুলেটের গতিকে হজম করে ফেলতে পারে। এই আইডিয়াটা থেকেই বুলেটপ্রুফ গ্লাসের সৃষ্টি।

এই বুলেট প্রুফ গ্লাসের আইডিয়া প্রথম​ সতের শতকের দিকে আসলেও ফ্রান্সের ক্যামিস্ট ​অ্যা​ডুয়ার্ড বানাডিক্টাস (Édouard Bénédictus) ​ আধুনিক বুলেট প্রুফ গ্লাসের স্বপ্নদ্রষ্টা । ১৯০৯ সালে তিনি এই গ্লাসের পেটেন্ট করেন। তিনি দু’টি গ্লাসের সীটের মধ্যে স্যান্ডউইচের মত​সেলোলয়িড (তখনকার প্লাস্টিক) একটি লেয়ার ব্যবহার করেন। পলিভিনাইলের আইডিয়া আসে ১৯৩৬ সালে পিটার্সবার্গ প্লেট গ্লাস কোম্পানির মাধ্যমে। 

১৯৩০ সালের আগে যদি আপনি বুলেট প্রুফ গ্লাসের ব্যবহার দেখতে চান গ্যাংস্টার অল কেপোনের ক্যাডিলাক ১৯২৮ মডেলের গাড়িটির কথা ​আসবে।  প্রথম অর্ডিনারি ভারী গ্লাসের সাহায্যে বুলেটপ্রুফ হিসেবে একে আখ্যায়িত করা হয়। এতে বর্তমানের মত লেমেনেটেড গ্লাস ব্যবহার করা হয় নি। 

গ্যাংস্টার আল ক্যাপোনের 1928 ক্যাডিল্যাক

​আল ক্যাপোনের ক্যাডিলাক ১৯২৮ মডেলের টাউন সেডান গাড়িটি ১৯১২ সালে সেন্ট জোন্সে অকশনে $৩৪১০০০ ডলারে  বিক্রি হয় !

​বুলেটপ্রুফ বা বুলেট প্রতিরোধী গ্লাস দেখতে কিন্ত একেবারেই সাধারন ​গ্লাসের মতো । বুলেট প্রতিরোধী গ্লাসকে এমন ভাবে বানানো হয় যে এটি টানা কয়েক রাউন্ড গুলি সহ্য করার উপযোগী হয়। তবে ​ প্রতিরোধ ​ ক্ষমতা ​ নির্ভর করে গ্লাসটি কতটা পাতলা বা মোটা এবং কোন ​অস্ত্রের সাহায্যে গুলি করা হবে তার উপরে।

​বুলেট প্রুফ গ্লাসের গঠন​

বুলেট প্রুফ গ্লাসকে এমনভাবে বানানো হয় যে এতে গুলি করা হলে গুলির ভরবেগ চুষে নেওয়া ক্ষমতা থাকে। এ গ্লাস যদিও পুরুপুরি বুলেট প্রুফ নয় তাই একে বুলেট রেজিস্ট্যান্ট বা গুলি প্রতিরোধী গ্লাস বলা আরো যৌক্তিক হবে।

বুলেট প্রুফ গ্লাস মূলত একটি গ্লাস নয় বরং এটি হল অনেকগুলো স্তরের সমন্বয়ে গঠিত। যত স্তর তত বেশি সুরক্ষা।  প্রত্যেকটি স্তরের মধ্যে বিভিন্ন রয়েছে নানা ধরনের প্ল্যাস্টিক ​। অনেক গ্লাসের ভেতরের ফাইনাল স্তর পলি কার্বনেট দিয়ে তৈরি যা একটি ​উচ্চ মানের শক্ত প্ল্যাস্টিক। একটি শক্ত কাঁচ তারপরে শক্ত প্ল্যাস্টিক আবার কাঁচ আবার প্ল্যাস্টিক এভাবেই অনেক স্তর দিয়ে এই গ্লাসটিকে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয় ​। ​ফলে নর্মাল গ্লাস থেকে বুলেটপ্রুফ গ্লাসকে অনেক মোটা ​ হয়ে পড়ে । ​

​বুলেট প্রুফ গ্লাস তৈরিতে আর্মোরম্যাক্স, ম্যাক্রোক্লেয়ার, সাইরোলন, পলিভিনাইল বুটিরাল, পলিউরেথেন, সেন্ট্রিগ্লাস বা ইথিলিন-ভিনাইল অ্যাসিটেট সহ নানা পদার্থের লেয়ার ব্যবহার করা হয় সেসব বিস্তারিত গঠনে যাচ্ছি না । বুলেট প্রতিরোধী গ্লাসের ঘনত্ব সাধারনত ৭ মিলিমিটার থেকে ৭৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এ গ্লাসগুলো বিভিন্ন প্রটেকশন লেভেল অনুসারে বানানো হয়। প্রটেকশনের দশটি লেভেল রয়েছে যাদের UL 75​2 Level 1 থেকে UL 752 10 নামে অভিহিত করা হয়। প্রকেশন লেভেলের উপর নির্ভর নির্ভর করে বুলেট প্রুফ গ্লাসের বেশ কিছ প্রকারভেদ রয়েছে। ​​ইনসুলেটেড ব্যালস্টিক গ্লাস, ​আর্কলিক, পলি কার্বনেট গ্লাস ইত্যাদি। 

বুলেট প্রুফ গ্লাসগুলোর পুরুত্ব কত, কোন লেভেলের প্রটেকশন প্রদান করে আর কোন অস্ত্রের আক্রমন ঠেকিয়ে দিতে পারে​ স্বল্প পরিসরে সেসব জানতে নীচের টেবিলটি লক্ষ্য করি।

বড় করতে দেখতে ছবির উপরে ক্লিক করুন।

​গুলি প্রতিরোধী গ্লাস কিভাবে কাজ করে ? 

যখন একটি বুলেট গ্লাসের উপরে আঘাত করে তখন গুলির এনার্জিগুলো ​পার্শ্বাভিমুখভাবে বিভিন্ন স্তর দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। যে কারনে বুলেটের এনার্জি বেশ কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।  একটি মাত্র গ্লাসকে অতিক্রম করার পরিবর্তে এখানে একসাথে একটি শক্ত গ্লাস তারপরে শক্ত প্ল্যাস্টিক আবার গ্লাস আবার প্ল্যাস্টিক এভাবে বেশ কিছু স্তর অতিক্রম করার ফলে বুলেটের এনার্জি প্রশস্তভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে যার ফলে এনার্জিগুলো বিভিন্ন লেয়ার শোষণ করে ফেলে। 

এনার্জি শোষিত হতে থাকার ফলে বুলেটটি একটি স্তরের পরে স্তরে আগের গতি পায় না এভাবে শক্তি শোষিত হতে হতে একটি স্তরে গিয়ে স্থির হয়ে পড়ে।​

​সার কথা

​একদম সংক্ষিপ্ত আকারে বুলেট প্রুফ গ্লাস নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেহেতু এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ না তাই ভুল ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। তথ্যের উৎস হিসেবে রয়েছে উইকিপিডিয়া সহ বেশ কিছু ওয়েবসাইট।

মনজু
 

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments

Leave a Reply: