নাম পরিবর্তনের দেশ বাংলাদেশে ঘুরতে এসে ফিবোনাচ্চি যখন ফিবোনাক্কির খপ্পরে!

আমরা বড়ই পরিবর্তনশীল ধনী জাতি তাই বছর পাঁচেক পর পর কোটি টাকা খরচ করে দেশের বড় বড় স্থাপনার নামগুলো  পরিবর্তন করে বিশ্বের দরবারে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছি।  ধারবাহিকতাও দীর্ঘ।

সকালে ঘুম থেকে উঠে তুশির সাথে চ্যাট করছিলাম । কি কারনে জানি ফিবোনাচ্চি সিরিজের কথা মনে হল। ওকে জিজ্ঞেস করলাম

-ফিবোনাচ্চি সিরিজ চিনেন?

– হ্যাঁ। কিন্ত বিস্তারিত জানি না।

– 0, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, ২৩৩, ৩৭৭, ৬১০, ৯৮৭ … ইত্যাদি . সিম্পল ।

– ও হ্যাঁ।

-বলেন তো পার্থক্য কোথায় ?

-আগেরটার সাথে পরেরটা যোগফল এইভাবে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ভুলে গিয়েছিলাম।

-আচ্ছা মজার প্যাটার্ন আছে একটা দেখেন।

-কি প্যাটার্ন ?

– সিরিজটা খেয়াল করেন।

ফিবোনাচ্চি সিরিজ

ফিবোনাচ্চি সিরিজ

উপরেরটাকে আমরা সাধারন সংখ্যা সিরিজ ধরি , নীচেরটা হল ফিবোনাচ্চি সিরিজ।

লক্ষ্য করুন ফিবোনাচ্চি সিরিজে X3=2  এভাবে প্রতি তিন নাম্বার সংখ্যাটি ২ এর মাল্টিপল ( ২,৮, ৩৪, ১৪৪,৬১০……… )

৪ নাম্বার সংখ্যাটি X4=3 , যা ৩ এর মাল্টিপল এভাবে প্রতি চার নাম্বার সংখ্যাটি ৩ এর মাল্টিপল। (৩,২১,১৪৪………. )

৫ নাম্বার সংখ্যাটি X5= ৫। যা ৫ এর মাল্টিপল, এভাবে প্রতি ৫ নাম্বার সংখ্যাটি ৫ এর মাল্টিপল ((৫,৫৫,৬১০……)

-হু ঠিক আছে।

সারা দিন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম । বিকালে লাঞ্চ করে ফ্রি হয়ে ভাবলা আচ্ছা আমি তুশিকে কি সব ঠিক বলেছি ? সেই কত বছর আগে দেখেছিলাম একটা বইয়ে ফিবোনাচ্চি ধারা নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা।

গুগলের শরণাপন্ন হই। ফিবো লেখাতে গুগল আমাকে নিন্মোক্ত সাজেশান দেয়।

আচ্ছা তুশিকে কি তাহলে আমি ভুল শব্দ বললাম। 🙁 বিকালে নক দিলাম

-শব্দটা ফিবোনাক্কি। -_-

– 😀 😀

এইবার ভাবলাম কি ব্যাপার একটু ইউটিউব করে উচ্চারণ শুনে আসি। সব জায়গায় দেখলাম একই উচ্চারন ফিবোনাচ্চি।

-আরে ইউটিউবে দেখি ফিবোনাচ্চি। তাহলে শব্দটা বাংলাদেশে ঘুরতে এসে ফিবোবাক্কি হয়ে গেছে।

-হাঁ হাঁ হাহ 😀

ফিবোনাচ্চি সিরিজ/ধারা/ সংখ্যা কিভাবে আসল?

লিওনার্দো  লিওনার্দো পিসানো  একজন বিখ্যাত ইটালিয়ান গনিতবিদ ছিলেন। তিনি কিছু সংখ্যা নিয়ে গবেষনা করেছিলেন যা প্রাকৃতিক অনুপাত অনুসরন করে। সেগুলো এই রকম ছিল ১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪,৫৫,৮৯,১৪৪ এবং চলতে থাকবে। তার ডাক নাম ছিল ফিবোনাচ্চি।   এ নামানুসারেই পরবর্তিতে এই সিরিজের নাম হয়ে যায় ফিবোনাচ্চি সিরিজ বা ধারা।

১২০৩ সালে খরগোশের প্রজননে সর্বপ্রথম এই সিরিজের অস্তিত্ব  লক্ষ্য করেন।  ব্যাপারটা এমন যে যদি দু’টি খরগোশ থেকে প্রজনন শুরু হয়, আর একটি খরগোশও না না মরে তাহলে যদি ১০ মাসে ৫৫ টা খরগোশ হয় ১১ মাস পরে হবে ৮৯ টি , ১২ মাস পরে সংখ্যাটি দাঁড়াবে ১৪৪ !

মৃত্যুর আগে একবার তাকে ফিবোনাচ্চি সিরিজ  নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি রহস্য করে বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির মূল রহস্য এই রাশিমালাতে আছে।’

কিন্তু কি সেই রহস্য?

প্রকৃতিতে ফিবোনাচ্চি রাশিমালাঃ

ফিবোনাচ্চি সিকুয়েন্সটি প্রকৃতিতে প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। পৃথিবীর অসংখ্য ফুল, ফল, গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়, ক্যকটাস গাছের পুরুত্বে, পাইন গাছের মোচায়,সমুদ্রের ঢেউ এর বাঁক এবং এমনকি আমাদের গ্যালাক্সির স্পাইরাল বা প্যাঁচের মধ্যেও এই সিরিজটি  দেখতে পাওয়া যায়। শামুকের যে স্পাইরাল দেখা যায় সেখানেও ফিবোনাচ্চির রাশিমালার উপস্থিতি রয়েছ! প্রকৃতিতে এই সিকোয়েন্সটি এতই বেশি মাত্রায় ও ঘন ঘন দেখতে পাওয়া যায় যে একে একটি প্রাকৃতিক সিকোয়েন্স বললেও ভুল হবে না।

আসুন তাহলে কিছু উদাহরন দেখা যাক।

মৌমাছি আর ফিবোনাচ্চিঃ

মৌমাছি চিনি না এমন কাউকে হয়ত আমরা পাব না।  এই মৌমাছি প্রজাতিটির বংশ বৃদ্ধির মধ্যেও লুকিয়ে আছে ফিবোনাচ্চি রাশিমালা।

সাধারনত তিন ধরনের মৌমাছি দেখা যায়ঃ

১ম শ্রেণীঃ প্রত্যেকটি কলোনী বা মৌচাকে একটি বিশেষ মৌমাছি দেখতে পাওয়া যায় রানী মৌমাছি নামে পরিচিত,

২য় শ্রেণীঃ এই শ্রেণীর মৌমাছিকে বলে কর্মী মৌমাছি, যারা সবসময় বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত,

৩য় শ্রেণীঃ এরা কোন কাজ করে না অলস প্রানী আর কি 😛 , এদেরকে বলা হয় ড্রন বা পুরুষ মৌমাছি।

একটা মজার ব্যাপার আমরা হয়ত জানি না, রানী মৌমাছি একটি মহিলা মৌমাছির জন্ম দেয়ার জন্য পুরুষ মৌমাছির সঙ্গে মিলন ঘটানোর দরকার হয় (নিষিক্ত ডিম্বক) যেখানে পুরুষ মৌমাছির জন্ম দেয়ার জন্য রানী মৌমাছিকে পুরুষ মৌমাছির সঙ্গে মিলন ঘটানোর দরকার হয় না (অনিষিক্ত ডিম্বক)। অদ্ভুত তাই না ?

যদি মৌমাছিদের বংশ তালিকা তৈরি করি তাহলে সেটি হবে অনেকটা এরকমঃ

মৌমাছি ও ফিবোনাচ্ছি সিরিজ

মৌমাছি ও ফিবোনাচ্চি সিরিজ

ফুলের পাপড়িঃ

ফুল হাতে নেই নাই এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর ফুল হাতে নেওয়া মানেই পাপড়ি ছিড়েছি ! তবে যে কাজটি হয়ত করিনি  কখনো গুনে দেখা হয় নি। এক কাজ করুন একটা ফুল নিয়ে পাপড়ি গুনে দেখুন। দেখবেন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব ফুলই ফিবুনাচ্চির সিরিজ মেনে চলে !

চিত্রে আটটি ফুল আছেন দেখুন প্রথম থেকে শুরু করা যাক প্রথমেই আছে  হোয়াইট বা সাদা লিলি যা আছে ১ টি পাপড়ি, ইউফরবিয়ার থাকে ২ টি পাপড়ি, ট্রিলিয়ামের থাকে ৩ টি পাপড়ি, কলাম্বাইনের থাকে ৫ টি পাপড়ি, ব্লাড রুটের থাকে ৮ টি পাপড়ি, ব্ল্যাক আইড বা কাল চোখা সুজান ফুলে থাকে ১৩ টি পাপড়ি, শাস্তা ডেইজি ফুলের  থাকে ২১ টি পাপড়ি এবং সাধারন মেঠো ডেইজির থাকে ৩৪ টি পাপড়ি।

লক্ষ্য করুন পাপড়িগুলোর সিকুয়েন্স হল,   ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১ এবং ৩৪ এই সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকেই ফিবনাচ্চি সিকোয়েন্সের অন্তর্গত!

আনারস  এর স্পাইরালঃ 

নীচের ছবিটা দেখুন আনারসের স্পাইরালেও ফিবুনাচ্চির সংখ্যার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ! আনারস ও ফিবোনাচ্চি।

পাখির আকাশে উড়া

শীতের সময় আমাদের দেশে সুদূর সাইবেরিয়া হতে ঝাকে ঝাকে ‘অতিথি পাখি’   আসে।  এই অতিথি পাখির ঝাক গণনা করে দেখা গেছে তাদের একেকটি ঝাকে ২১টি পাখি থাকে, ২২ বা ২৩টি পাখি থাকে না। মজার না ব্যাপারটি ? ফিবোনাচ্চি সিরিজে ২১ সংখ্যাটি রয়েছে, ২২ বা ২৩ সংখ্যা নেই।

ধরুন কেউ একজন একটা পাখি শিকার করল । তখন দেখবেন এরা আবার দল ভেংগে ফিবোনাচ্চি অনুসরন করছে !

এ ছারাও অসংখ্য উদাহরন পাওয়া যাওয়া যাবে। এই ফিবোনাচ্চি সংখ্যার  কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে যা অন্য কোন সিকুয়েন্সে নাই।

ফিবোনাচ্চি সংখ্যার বৈশিষ্টঃ

সিকুয়েন্সের যে কোন চারটি সংখ্যা নেওয়া হলে প্রথম ও চতুর্থ সংখ্যার যোগফলের সাথে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার যোগফল বিয়োগ করা হলে ফলাফল অবশ্যই সবসময় ঐ চারটি সংখ্যার প্রথমটি হবে।

ধরা যাক চারটি ফিবোনাচ্ছি সংখ্যা হল ২, ৩ , ৫, ৮। প্রথম ও চতুর্থ সংখ্যার যোগফল ২ + ৮= ১০, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার যোগফল ৩ + ৫= ৮ বিয়োগ করলে বিয়োগফল হচ্ছে ২, যা কিনা আমাদের ধরে নেওয়া চারটি সংখ্যার প্রথম সংখ্যা !

ফিবোনাচ্চি সংখ্যা গোল্ডেন রেশিও ম্যানে চলে! 

পাশা পাশি দুইটি ফিবোনাচ্চি সংখ্যার পরের সংখ্যাকে আগের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করুন। কি আসে ১.৬১ ?  যেমন আপনি ৬১০ কে ৩৭৭ দিয়ে ভাগ করে দেখুন  ফলাফল কি আসে ?  ১.৬১  তাই না ? এটিই হচ্ছে গোল্ডেন রেশিও

আচ্ছা এখন মজার ব্যাপার দেখি, ভাজ করা অবস্থায় আপনার হাতে কব্জি আর বাকি অংশের দৈর্ঘের অনুপাত বের করি বড় সংখ্যা আর ছোট সংখ্যার অনুপাত ১.৬১ এর কাছাকাছি ! আহ গোল্ডেন রেশিও 😀

বকবক তো অনেক হয়ে গেল !

ফিবোনাচ্ছি দিবস

ফিবোনাচ্চি দিবসও আছে নাকি আবার ?  হুম ফিবোনাচ্চি দিবসও কিন্ত আছে  ! নবেম্বরের ২৩ তারিখ ফিবোনাচ্চি দিবস হিসেবে পালিত হয়। দেখুন সাজাই ১১ মাস ২৩ তারিখ তাহলে কি দাড়লো ১১২৩ । আরে এটাও দেখি ফিবোনাচ্চি সিকুয়েন্সে। এই নভেম্বর তো গেল। তাহলে পরবর্তি নভেম্বরে সবাইকে সবাইকে ফিবোনাচ্চি দিবস সম্পর্কে অবহিত করি।

নোটঃ জনাবা রুবাইয়াকে  ধন্যবাদ দিচ্ছি। 🙂

তথ্য সূত্রঃ ইন্টারনেট।

মনজু
 

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments

Leave a Reply: