একটি অসমাপ্ত গল্প

তুশি এমবিবিএস করছে। বাসার বারান্দাটা তার খুব প্রিয় সামনে দুইটা পুকুর আর বাসার সামনেই মাঠ। কি অদ্ভুত সুন্দর।

প্রতিদিন ক্লাস শেষে বিকালে হাতে এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে । বাসার সামনে বাচ্চাদের খেলা দেখে। এটা তার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গেছে। বাচ্চাদেরকে তুশি খুব পছন্দ করে।

একটি অসমাপ্ত গল্প

আজান নামের একটা ৫ বছরের বাচ্চাকে প্রতিদিন ব্যাট হাতে মাঠে দেখে। ইস কি কিউট। কি সুন্দর করে হাটে । নিজের নারী সত্ত্বা’ জেগে উঠে ইস আমার যদি আযানের মত একটা বাচ্চা থাকত।

আজ রবিবার হিউম্যান এনাটমি নিয়ে ল্যাবে ক্লাস ছিল। ডোম ঘরে বদরুল স্যার একটা বেওয়ারিশ লাশ কেটে সবাইকে মানব দেহের ইন্টারনাল অর্গানগুলো দেখাচ্ছিলেন আর তাদের কাজ বর্ণনা করছিলেন। হার্ট ব্লক হলে কোন লোকেশানে রিং পড়াতে হয়। এপেন্ডিক্সের ব্যাথা হলে কোন অংশটা কেটে ফেলে দিতে হয়।
বদরুল স্যার খুব সুন্দর করে কথা বলেন ।

– আচ্ছা তুশি তুমি কি জান মানুষের এপেন্ডিক্স কেন কোন কাজে লাগে না ?

– না স্যার বলতে পারছি না।  

– হুম ঠিক আছে। সিয়াম, শান্ত , জনি, নিশাত, আরিয়ান তোমরা কেউ বলতে পারবা ?

– না স্যার।

-আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলছি শোন।  তোমরা কেউ কি বিবর্তন বাদে বিশ্বাস কর?

– ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না স্যার আসলে কি করা উচিত। হিউম্যান এনাটমি আর বিহেবিয়ার এনালাইসিস করলে অন্তত তাই মনে হয় । আমি কনফিউজ (সিয়াম)

-তুশি তুমি কিছু বলবে ? তোমার এনালাইসিস বরবার সবার থেকে আলাদা।

– আমাদের ধর্মে তো স্পষ্ট বলা আছে যে এডাম আর ইভ’কে প্রথমে পাঠানো হয় সে ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদের মত তত্ত্বের কোন দরকার পড়ে না । বিবর্তনবাদে অনেকগুলো মিসিং লিঙ্ক পাওয়া যায় যা এখনো বিবর্তনবাদীদের কেউ সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে নি। তাই স্যার আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী না। (তুশি )

– বাহ তুমি সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছি মিসিং লিংক সম্পর্কিত। কিন্ত বিজ্ঞান তো এ সব বিশ্বাস করে না । তুমি স্বপক্ষে আর কিছু বলতে চাও।

– প্রায় ৭ মিলিয়ন বছর আগে প্রাইমেট (গ্রেট এপ বা মহান বানর শিম্পাঞ্জি) থেকে আলাদা হয়ে পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের ধারায় সাড়ে চার মিলিয়ন বছর আগে প্রথম মানব (হোমো জেনাস) জন্ম নেয় পৃথিবীতে, যাদেরকে অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির বলে চিহ্নিত করেন বিজ্ঞানীরা।

শিম্পাঞ্জি বা পিগমি শিম্পাঞ্জি (বনোবো) থেকে আলাদা হয়েছিলাম আমরা, তাদের পরের ধাপ বা মানুষ হয়ে ওঠার আগের ধাপ কি ছিল?- তা জানতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে গবেষকদের। কারণ, শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের মাঝের ধাপটিতে রয়ে গেছে ১৫ থেকে ২৫ লাখ বছরের একটি বড় শূন্যতা।

বিজ্ঞানীরা বানর ও আমাদের মধ্যে এ ‘মিসিং লিঙ্ক’ খুঁজে চলেছেন আজও। তার মানে স্যার আসলে তারা শূন্যে শব্দ খোজা টাইপের গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছে। (তুশি )

– বাহ বাহ বাহ, ইম্প্রেসিভ, আমি ইম্প্রেসড।  তুশি তুমি এত কিছু জানলে কিভাবে ? আচ্ছা থাক আমরা অন্য একদিন সেই ব্যাপারটা জানবো চলে লেকচারে ফেরা যাক। কারো কোন প্রশ্ন?
(সবাই চুপ)

-ওয়েল ফাইন , ধরনা করা হয় প্রাইমেট যুগে মানুষ যখন আগুন আবিষ্কার করতে পারে নি তখন সব কিছু কাচা খেত। এই কাচা খাবারগুলো হজম মানে ভেংগে একে শরীরের উপযোগী খাবার বানাতে এখন যে এনজাইমগুলো লাগে সেই এইজাইম গুলো থেকে অতিরিক্ত কিছু এনজাইম লাগত।

সেই অতিরিক্ত এনজাইম আসত এই এপেন্ডিক্স থেকে। কাল ক্রমে মানুষ আগুন আবিষ্কার করল পুড়িয়ে বা সিদ্ধ্ব করে খেতে শিখল। আস্তে ধীরে তখন এই অর্গানটি তার কার্যক্ষমতা হারায়।

অ্যাপেনন্ডিক্স হচ্ছে ২ থেকে ২০ সে.মি. দৈর্ঘের নলাকার একটি অঙ্গ। এটি এই যে দেখ বৃহদন্ত্রের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। যদি কোনো কারণে অ্যাপেনন্ডিক্সের মধ্যে ইনফেকশন হয়, তখন এটি ফুলে যায় এবং প্রদাহ হয়। একেই অ্যাপেনডিসাইটিস বলে।

এপেনন্ডিক্স কোন কারনে ফেটে গেলে জীবাণু সমগ্র পেটে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থা পেরিটোনাইটিস নামে পরিচিত। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা। এরকম হলে রোগীর মৃত্যুঝুকি থাকে। আবার কম তীব্রতার এ্যাপেন্ডিসাইটিস আছে যেটা এ্যাপেন্ডিসাইটিস রাম্বলিং হিসাবে পরিচিত। তখন অপ্রয়োজনীয় বিধায় একে কেটে ফেলে দেওয়া হয়।

কারো কোন কোন প্রশ্ন ?
(সবাই চুপ)

অনেক দিন ধরে হিউম্যান এনাটমির প্র্যাক্টিকেলের জন্যে লাশ খোজা হচ্ছিল । বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যাচ্ছিল না বিধায় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ক্লাস করে তুশি প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে বাসা ফিরে।

প্রতিদিনের মত এক কাপ হাতে আযান ও রিহাদের খেলা দেখছিল (রিহাদ তুশি র ছোট ভাই )

হটাত একটি উষ্কুখুষ্কু চুলের ছেলে মাঠে প্রবেশ করতে আযান তার কোলে দৌড়ে গিয়ে উঠে।
তুশি প্রচন্ড বিরক্ত হয় ঐ ছেলেটার প্রতি। কি সুন্দর খেলা দেখছিল আর উনি এসে দিল ভুন্ডুল করে। এর পরের দিনগুলোতে প্রতিদিন আযানের আর রিহাদে খেলা দেখতে আসত ছেলেটি।

তুশি র প্রথম দুই দিন বিরক্ত লাগলে তৃতীয় দিন একটু ভাল করে লক্ষ করল ছেলেটিকে। বয়স কত হবে চব্বিশ-পঁচিশ হবে দেখতে। শ্যাম বর্নের দেখতে এতটা সুন্দর না হলেও একদম খারাপ না । চেহারাতে একটা মায়া আছে।

পরে দিন খেলা দেখছিল আর মনে মনে তুশি ভাবতেছিল
– এই যে মশায় চুল দাড়ি কিছু কাটতে পারেন না ? নাকি আমি কেটে দিব কাচি দিয়ে?

– আরে এই সব কি ভাবছি আমি, কোথাকার কোন ছেলে তাকে নিয়ে চিন্তা করছি।

পরের দুই দিন ল্যাবের ব্যস্ততায় আর বিকালে বাসায় ফিরা হয় নি।

বুধবার ক্লাস অফ ছিল তাই খুশ মেজাজে তুশি কাপ দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
মাঠে আর একটি নতুন ছেলে দেখা যাচ্ছে আগের বাউন্ডুলেকে দেখা যাচ্ছে না । তুশির মন খারাপ হল।
হটাত করে বল নিতে ছেলেটি মাঠের এই প্রান্তে চলে আসল । তুশি খেয়াল করে দেখল আরে এ তো সেই ছেলেটি কি অদ্ভুত মায়াবি চেহারা। চুল দাড়ি কেটে একদম অন্য রকম লাগছে।

-কি মশায় কাল ঝাড়ি দিতে আজকেই সব চুল-দাড়ি কেটে আমাকে দেখাতে চলে আসলেন ?

– আরে অদ্ভুত তো আমি কি ভাবছি এসব। কোথাকার কোন ছেলে চিনি না জানি না ধুত্তরি।

-আচ্ছা থাক কাউকে নিয়ে তো কোন দিন মনে ডাল পালা গজায় নি । ওকে নিয়ে গজাক দেখি কতদূর যেতে পারে।

এমন সময় বল কুড়াতে ছেলেটে মাঠের এই প্রান্তে চলে আসল। হটাত করে উপরে তাকাতে ছেলেটি তুশিকে দেখতে পেয়ে একটি মুচকি হাসি দিল।

-কি মিয়া মেয়ে দেখলেই হাসি দিতে হয় ? দাঁড়াও তোমাকে মজা দেখাবো সুযোগ মত পেয়ে নেই। (মনে মনে তুশি বলে উঠে)

খেলা শেষে ছেলেটি রিহাদকে কি যেন দিল তার পকেট থেকে বের করে।
মাগরিবের আযান দিচ্ছে রিহাদ ঘরে প্রবেশ করতেই তুশি বলে উঠল

– কিরে ঐ ছেলেটা তোকে কি দিল আর জানা নাই জানা নাই তুই নিলি কিভাবে?

– আরে আপু উনি অপরিচিত হতে যাবে কেন ? ও আযানের চাচ্চু হয়। রন আংকেল। ইউনিভার্সিটি শেষ করে এখন নাকি ঢাকায় চাকরির চেষ্টা করছেন। আজ রাতে চলে যাবে। আমাকে দুইটা কীট ক্যাট দিল জোড় করে।

-আচ্ছা তুই যা ফ্রেশ হয়ে নামায পড় যা।

তুশি ভাবছে আচ্ছা লোকটার আজকেই যাওয়া লাগবে কেন ? কয়েকটা দিন পরে গেলে কি হত ? 🙁

পরবর্তি লেখা এখানে

মনজু
 

Click Here to Leave a Comment Below 0 comments

Leave a Reply: